বিনিয়োগে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি

গলানো হচ্ছে নামি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল ঘড়ি

স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এক নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে বিলাসবহুল ঘড়ির বাজারে।

ওমেগা বা ট্যাগ হিউয়ারের মতো বিশ্বের নামি ব্র্যান্ডগুলো পুরনো বিলাসবহুল ঘড়ি গলিয়ে পুনরায় স্বর্ণে রূপান্তর করছে। সেকেন্ড-হ্যান্ড বা ব্যবহৃত ঘড়ি হিসেবে এগুলো বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যেত, তার চেয়ে বেশি লাভ হচ্ছে ঘড়িতে থাকা স্বর্ণ গলিয়ে। ব্যবসায়ী, শিল্প বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগ উপদেষ্টাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ওমেগা ব্র্যান্ডের কনস্টেলেশন মডেলের ঘড়িটি বিশ্বজুড়ে আভিজাত্যের প্রতীক। জর্জ ক্লুনি বা নিকোল কিডম্যানের মতো তারকারা বিভিন্ন সিনেমা ও জমকালো অনুষ্ঠানে এ ঘড়ি পরে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু অতি সম্প্রতি এ চমৎকার ঘড়িগুলো চলে যাচ্ছে স্বর্ণ গলানোর চুল্লিতে।

ব্রিটিশ গোল্ড ডিলার জন হোয়াইট গত মে মাসে ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকের একটি ওমেগা কনস্টেলেশন ঘড়ি গলিয়ে ফেলেন। সম্পূর্ণ ‘ভালো’ অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে থাকায় তিনি এটি গলাতে বাধ্য হন বলে জানান।

জন হোয়াইট বলেন, ঘড়িটি নিলামে তোলা হলে বড়জোর ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার পাউন্ড পাওয়া যেত। কিন্তু ওই ঘড়িতে থাকা ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের বাজারমূল্য ওই সময় ছিল ৫ হাজার ৭৫০ পাউন্ড (প্রায় ৭ হাজার ৭৪৯ ডলার)। ঘড়িটি আস্ত বিক্রি করার চেয়ে গলিয়ে ফেলায় ৩৫ শতাংশ বেশি অর্থ পাওয়া গেছে।

অ্যানালগ শিফটের প্রতিষ্ঠাতা জেমস ল্যামডিন জানান, বাজারে যে পুরনো ঘড়িগুলোর সংগ্রহযোগ্য মূল্য তৈরি হয়নি, সেগুলোই মূলত গলানো হচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগের কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ বেছে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে জানুয়ারিতে বিশ্ববাজারে মূল্যবান ধাতুটির দাম আউন্সপ্রতি রেকর্ড ৫ হাজার ৬০০ ডলারে গিয়ে ঠেকে। তবে স্বর্ণের দামের সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যবহৃত বা সেকেন্ড-হ্যান্ড ঘড়ির বাজারমূল্য সেভাবে বাড়েনি।

ঘড়ি ইতিহাস বিশেষজ্ঞ আদ্রিয়ান হেইলউড এ প্রবণতায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোনো একটি ঐতিহাসিক ঘড়ি একবার গলিয়ে ফেললে তা চিরতরে হারিয়ে যায়।’

বিলাসবহুল ঘড়ি গলানোর সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বিশ্বজুড়ে স্বর্ণ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ (রিসাইক্লিং) ৫ শতাংশ বেড়ে ৩৬৬ টনে দাঁড়িয়েছে। একই সময় স্বর্ণের অলংকারের চাহিদা থেকে ৩১ শতাংশ বেড়ে ৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি বিলাসবহুল ঘড়িতে সামান্য পরিমাণ থেকে শুরু করে ২০০ গ্রামের বেশি স্বর্ণ থাকতে পারে। ফলে ঘড়ির কাঠামো ও বেল্ট থেকে পাওয়া স্বর্ণের মূল্য হাজার হাজার ডলার উঠে যায়। চলতি বছর বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৪০০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে আগামী দিনগুলোয় ঘড়ি গলানোর প্রবণতা আরো বাড়তে পারে। কারণ ব্যবহৃত ঘড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ওয়ারেন্টি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হয়, যা স্বর্ণ গলিয়ে বিক্রির ক্ষেত্রে লাগে না।

ব্যবহৃত ঘড়ির পাশাপাশি অনেক নতুন ঘড়িও এখন গলানো হচ্ছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

জেমস ল্যামডিন জানান, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন করায় অনেক ঘড়ি বাজারে বিক্রি হয় না। একেবারে নতুন ও অব্যবহৃত থাকা সত্ত্বেও এসব বাড়তি ঘড়ির কাঠামো ভেঙে স্বর্ণ আলাদা করে ফেলা হচ্ছে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সোয়াচ ও রোল্যাক্সের মুখপাত্ররা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আরও